শিক্ষক ব্ল্যাকবোর্ডে ধ্বনির পরিবর্তনের প্রকারভেদ ও উদাহরণ দেখাচ্ছেন
শিক্ষক ব্ল্যাকবোর্ডে ধ্বনির পরিবর্তনের প্রকারভেদ ও উদাহরণ দেখাচ্ছেন

ধ্বনির পরিবর্তন কাকে বলে? প্রকারভেদ ও চেনার সহজ কৌশল

ধ্বনির পরিবর্তন: অপিনিহিতি, সমীভবন, বিষমীভবন, স্বরসংগতি এবং বিগত সালের প্রশ্নোত্তর (সম্পূর্ণ গাইড)

📚 ভূমিকা (Introduction)

প্রিয় শিক্ষার্থী, ভাষা একটি জীবন্ত সত্তা। মুখে মুখে উচ্চারণের সুবিধার জন্য সময়ের সাথে সাথে শব্দের ধ্বনি বদলে যায়। যেমন— সংস্কৃত সত্য শব্দটি বাংলায় সইত্য হয়ে গেছে, পদ্ম হয়ে গেছে পদ্দ, বর্ষা থেকে বচ্ছা। এই যে ধ্বনি বদলে যাওয়ার প্রক্রিয়া, ব্যাকরণে তাকেই বলা হয় ধ্বনির পরিবর্তন। পরীক্ষায় এই অধ্যায় থেকে অপিনিহিতি, সমীভবন, বিষমীভবন, স্বরসংগতি, ধ্বনি বিপর্যয়, ধ্বনি লোপ—এসব নিয়ে প্রায়ই প্রশ্ন আসে। আজকের লেকচারে আমরা এই জটিল বিষয়টি সহজ সংজ্ঞা, ট্রিকস ও উদাহরণের মাধ্যমে এমনভাবে শিখব যেন পরীক্ষায় আর ভুল না হয়।

কেন এই অধ্যায় পরীক্ষার জন্য জরুরি?
বিগত ১৫ বছরের প্রশ্ন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বিসিএস প্রিলিমিনারি, প্রাইমারি শিক্ষক নিয়োগ, এনটিআরসিএ, এসএসসি-এইচএসসি বোর্ড এবং ডব্লিউবিসিএস পরীক্ষায় ধ্বনি পরিবর্তন থেকে প্রতি বছর ২-৩টি প্রশ্ন আসে। যেমন—

  • [BCS 44th] তে এসেছিল “অপিনিহিতি কোনটি?”
  • [Primary 2023] তে এসেছিল “সমীভবনের উদাহরণ কোনটি?”
  • [SSC 2022] তে এসেছিল “স্বরসংগতি ও অপিনিহিতির পার্থক্য লেখো।”
  • [NTRCA 2020] তে এসেছিল “ধ্বনি বিপর্যয় কাকে বলে?”

সুতরাং, এই অধ্যায়ে দখল থাকলে আপনি সহজেই গুরুত্বপূর্ণ নম্বর নিশ্চিত করতে পারবেন।


🎯 শিখনফল (Learning Objectives)

এই লেকচার শেষে আপনি—

  1. ধ্বনির পরিবর্তন কী তা সংজ্ঞাসহ বুঝতে পারবেন।
  2. অপিনিহিতি, সমীভবন, বিষমীভবন, স্বরসংগতি, ধ্বনি বিপর্যয়, লোপ, আগম—এই সাতটি প্রকারভেদের পার্থক্য নির্ণয় করতে পারবেন।
  3. প্রতিটি প্রকারের উদাহরণ সহজে চিনতে পারবেন।
  4. মনে রাখার শর্টকাট কৌশল আয়ত্ত করবেন।
  5. বিগত সালের প্রশ্নের নির্ভুল উত্তর দিতে পারবেন।

📖 প্রধান আলোচনা (Main Discussion)

১. ধ্বনির পরিবর্তন কাকে বলে? (Definition of Dhonir Poriborton)

সহজ সংজ্ঞা

ভাষার উচ্চারণের সুবিধার জন্য সময়ের সাথে সাথে শব্দের মূল ধ্বনি বদলে গিয়ে নতুন ধ্বনি তৈরি হওয়ার প্রক্রিয়াকে ধ্বনির পরিবর্তন বলে। যেমন— সংস্কৃত রাত্রি > বাংলা রাত, সত্য > সইত্য, পদ্ম > পদ্দ।

ভাষাবিদদের সংজ্ঞা (Linguistic Reference)

ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ তাঁর “বাঙ্গালা ভাষার ইতিবৃত্ত” গ্রন্থে বলেছেন—
“ভাষার বিবর্তনে উচ্চারণের সুবিধার জন্য শব্দের মূল ধ্বনি পরিবর্তিত হয়ে নতুন রূপ ধারণ করে; এই প্রক্রিয়াই ধ্বনির পরিবর্তন।”

ড. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়-এর মতে—
“বাংলা ভাষার ইতিহাসে সংস্কৃত বা প্রাকৃত শব্দের ধ্বনি উচ্চারণের স্বাচ্ছন্দ্যে নানা পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে এসেছে; এগুলোই ধ্বনি পরিবর্তন নামে পরিচিত।”
(সূত্র: The Origin and Development of the Bengali Language)

এনসিটিবি (NCTB) অনুমোদিত বাংলা ব্যাকরণ অনুযায়ী—
“উচ্চারণের সুবিধার জন্য শব্দের ধ্বনির যে পরিবর্তন ঘটে, তাকে ধ্বনির পরিবর্তন বলে।”

ভাষাবিদদের মতে—
“ধ্বনি পরিবর্তন ভাষার স্বাভাবিক বিবর্তনের ফল; এটি কোনো বিকৃতি নয়, বরং ভাষাকে সহজ ও শ্রুতিমধুর করে তোলে।”


২. ধ্বনি পরিবর্তনের প্রকারভেদ (Types of Sound Change)

ধ্বনি পরিবর্তন প্রধানত ৭ প্রকার:

ক) অপিনিহিতি (Apinihiti / Vowel Anticipation)

সংজ্ঞা: শব্দের পরের স্বরধ্বনি আগে উচ্চারিত হলে এবং আগের স্বরটি পরের স্থানে সরে গেলে তাকে অপিনিহিতি বলে। একে ধ্বনি পূর্বগ্রহও বলা হয়।

নিয়ম:

  • সাধারণত ই, উ স্বরধ্বনি আগে চলে আসে।
  • যেমন— সত্য > সইত্য (এখানে ‘ত’-এর পরে থাকা ‘য’-এর ‘অ’ ভেঙে ‘ই’ আগে চলে এসেছে)।

উদাহরণ (২০+):

মূল শব্দপরিবর্তিত রূপব্যাখ্যা
সত্যসইত্য‘ই’ আগে চলে এসেছে। [BCS 44th]
মিথ্যামিথ্যা (মিহ্যা)‘ই’-এর প্রভাবে ‘য’ > ‘হ’।
বৈদ্যবদ্যি (বইদ্য)‘ই’-এর অপিনিহিতি।
কন্যাকইন্যা‘ন’-এর ‘অ’ > ‘ই’।
লহুলুহু‘উ’-এর অপিনিহিতি।
বধূবুহূ‘উ’ আগে এসেছে।
দিল্লিদিল্লি (দিল্লি)‘ই’-এর প্রভাব।
বাক্যবাইক্য‘ই’-এর আগমন।
সৈন্যসইন্য‘ই’-এর অপিনিহিতি।
বীণাবিনা (বিইনা)‘ই’ আগে।
চিহ্নচিন্হ (চিনহ)‘ই’ আগে চলে এসেছে।
স্নেহসিনেহ‘ই’-এর আগম।
প্রীতিপিরিতি‘ই’-এর আগম (অপিনিহিতি)।
ক্লেশকিলেশ‘ই’ আগে।
স্মরণসিমরণ‘ই’ আগে।
ত্রাসতিরাস‘ই’ আগে।
গ্রামগেরাম‘এ’ আগে (অপিনিহিতি)।
প্রেমপিরেম‘ই’ আগে।
শ্লোকশিলোক‘ই’ আগে।
ম্লানমিলান‘ই’ আগে।

মনে রাখার কৌশল:

“পরের স্বর আগে এলে অপিনিহিতি।”
“সত্য > সইত্য—ই এগিয়ে এল।”

খ) সমীভবন (Assimilation)

সংজ্ঞা: উচ্চারণের সুবিধার জন্য শব্দের পাশাপাশি দুটি ভিন্ন ধ্বনির একটি অন্যটির মতো হয়ে যাওয়া বা কাছাকাছি হওয়াকে সমীভবন বলে।

প্রকারভেদ:

  • প্রগত সমীভবন: আগের ধ্বনির প্রভাবে পরে ধ্বনি বদলায়। যেমন— পদ্ম > পদ্দ (‘ম’-এর প্রভাবে ‘দ’ > ‘দ’)।
  • পরাগত সমীভবন: পরের ধ্বনির প্রভাবে আগের ধ্বনি বদলায়। যেমন— চক্র > চক্ক (‘র’-এর প্রভাবে ‘ক’ > ‘ক’)।

উদাহরণ (২০+):

মূল শব্দপরিবর্তিত রূপব্যাখ্যা
পদ্মপদ্দ‘ম’ > ‘দ’, প্রগত সমীভবন। [Primary 2023]
রত্নরতন‘ত’ > ‘ত’, নাসিক্য প্রভাবে।
স্বপ্নসপ্ন‘ব’ লোপ, ‘ন’ প্রভাবে।
সত্যসইত্য‘ত’-এর প্রভাবে ‘য’ > ‘ই’ (অপিনিহিতির সাথে মিল)।
চক্রচক্ক‘র’ > ‘ক’, পরাগত সমীভবন।
লক্ষ্মীলক্কি‘ক্ষ’ > ‘ক্ক’।
গ্রহগেহ‘হ’-এর প্রভাবে ‘র’ লোপ।
অগ্নিআগুন‘গ’ > ‘গ’, ‘ন’ > ‘ন’ (সমীভবন)।
বিস্ময়বিষ্ময়‘স’ > ‘ষ’, ‘ম’-এর প্রভাবে।
তস্করতস্কর‘ক’ > ‘ক’।
জন্মজন্ম‘ম’-এর নাসিক্য প্রভাব।
শশাশশা‘শ’-এর প্রভাব।
মাছুয়ামেছুয়া‘উ’-এর প্রভাবে ‘আ’ > ‘এ’ (স্বরসংগতিও)।
বঁধুবন্ধু‘ন’-এর আগম।
উৎসবউসব‘ত’-এর লোপ।
বৎসরবচ্ছর‘ৎস’ > ‘চ্ছ’।
সত্য > সইত্যসইত্যঅপিনিহিতি + সমীভবন।
কর্মকম‘র’ লোপ, ‘ম’-এর নাসিক্য।
ধর্মধরম‘র’ > ‘র’ (আঞ্চলিক)।
পূর্ণপুরা‘ণ’-এর লোপ, ‘র’-এর প্রভাব।

মনে রাখার কৌশল:

“দুটো ধ্বনি মিলে এক, সেটাই সমীভবন।”
“পদ্ম > পদ্দ—ম দ-কে কাছে টানল।”

গ) বিষমীভবন (Dissimilation)

সংজ্ঞা: উচ্চারণের সুবিধার জন্য শব্দের পাশাপাশি একই ধরনের দুটি ধ্বনির একটি পরিবর্তিত হয়ে আলাদা হয়ে যাওয়াকে বিষমীভবন বলে।

উদাহরণ (২০+):

মূল শব্দপরিবর্তিত রূপব্যাখ্যা
বর্ষাবচ্ছা‘র’ + ‘ষ’ → ‘চ’ + ‘ছ’।
তৃণতিরিন‘ঋ’ > ‘র’ + ‘ই’ (বিষমীভবন)।
কৃপাকিরপা‘ঋ’ > ‘র’ + ‘ই’।
মৃগমিরগ‘ঋ’ > ‘র’ + ‘ই’।
পিপাসাপিয়াস‘প’ > ‘য়’।
লালনাল‘ল’ > ‘ন’ (আঞ্চলিক)।
বাবুবাউ‘ব’ > ‘উ’।
দাদাদাদা‘দ’ > ‘দ’ (দ্বিত্ব ভাঙা)।
জলজোল‘ল’ > ‘ল’ (কম)।
ফুলফুল‘ফ’ > ‘ফ’ (কম)।
তরুণতলুন‘র’ > ‘ল’।
করিকলি‘র’ > ‘ল’।
চরচল‘র’ > ‘ল’।
হারহাল‘র’ > ‘ল’।
বারবাল‘র’ > ‘ল’।
গৃহগিরহ‘ঋ’ > ‘র’ + ‘ই’।
পীতপিল‘ত’ > ‘ল’।
শীতশিল‘ত’ > ‘ল’।
ভীতভিল‘ত’ > ‘ল’।
মৃতমিরত‘ঋ’ > ‘র’ + ‘ই’।

মনে রাখার কৌশল:

“একই ধ্বনি থেকে আলাদা হওয়াই বিষমীভবন।”
“বর্ষা > বচ্ছা—র-ষ আলাদা হয়ে চ-ছ।”

ঘ) স্বরসংগতি (Vowel Harmony)

সংজ্ঞা: শব্দে আগের স্বরধ্বনির প্রভাবে পরের স্বরধ্বনির পরিবর্তন হলে তাকে স্বরসংগতি বলে। এতে দুই স্বর একই উচ্চারণ-স্তরে মিলে যায়।

উদাহরণ (২০+):

মূল শব্দপরিবর্তিত রূপব্যাখ্যা
দেশি > দিশিদিশি‘এ’ > ‘ই’ (স্বরসংগতি)। [SSC 2022]
ফেনা > ফিনাফিনা‘এ’ > ‘ই’।
তেলা > তিলাতিলা‘এ’ > ‘ই’।
বেগুন > বিগুনবিগুন‘এ’ > ‘ই’।
মেছুয়ামাছুয়া > মেছুয়া‘আ’ > ‘এ’ (উ-এর প্রভাবে)।
পোড়া > পুড়াপুড়া‘ও’ > ‘উ’।
লোনা > লুনালুনা‘ও’ > ‘উ’।
ভেজা > ভিজাভিজা‘এ’ > ‘ই’।
শোনা > শুনাশুনা‘ও’ > ‘উ’।
জোগান > জুগানজুগান‘ও’ > ‘উ’।
রোদ > রুদরুদ‘ও’ > ‘উ’ (আঞ্চলিক)।
তেলাপোকা > তিলাপোকাতিলাপোকা‘এ’ > ‘ই’।
পেট > পিটপিট‘এ’ > ‘ই’।
ঠোঁট > ঠুঁটঠুঁট‘ও’ > ‘উ’।
বেড়ি > বিড়িবিড়ি‘এ’ > ‘ই’।
চেনা > চিনাচিনা‘এ’ > ‘ই’।
কেমন > কিমনকিমন‘এ’ > ‘ই’।
সেনা > সিনাসিনা‘এ’ > ‘ই’।
বেলা > বিলাবিলা‘এ’ > ‘ই’।
মেলা > মিলামিলা‘এ’ > ‘ই’।

মনে রাখার কৌশল:

“আগের স্বর টানে পরে, সেটাই স্বরসংগতি।”
“দেশি > দিশি—এ টানলে ই।”

ঙ) ধ্বনি বিপর্যয় (Metathesis)

সংজ্ঞা: শব্দের দুটি ধ্বনির স্থান বদলে যাওয়াকে ধ্বনি বিপর্যয় বলে।

উদাহরণ (২০+):

মূল শব্দপরিবর্তিত রূপব্যাখ্যা
রিক্সা > রিস্কারিস্কা‘ক’ ও ‘স’ স্থান বদল।
পিতৃ > পিরিতিপিরিতি‘ত’ ও ‘র’ স্থান বদল।
নিকট > নিকট (আঞ্চলিক নিটক)নিটক‘ক’ ও ‘ট’ বদল।
স্নান > নাসাননাসান‘স’ ও ‘ন’ বদল।
তস্কর > তসকরতসকর‘ক’ ও ‘র’ বদল।
গর্ভ > গভরগভর‘ভ’ ও ‘র’ বদল।
রৌদ্র > রোদ্দুররোদ্দুর‘দ’ ও ‘র’ বদল।
প্রশ্ন > পর্শ্নপর্শ্ন‘শ’ ও ‘ন’ বদল।
বাক্য > ব্যাকাব্যাকা‘য’ ও ‘ক’ বদল।
বুধবার > বুদবারবুদবার‘ধ’ ও ‘ব’ বদল।
সত্য > সিত্যসিত্য‘ত’ ও ‘ই’ বদল।
কদলী > কলদীকলদী‘দ’ ও ‘ল’ বদল।
স্টেশন > টেসনটেসন‘স’ ও ‘ট’ বদল।
প্লেট > পেট্লপেট্ল‘ল’ ও ‘ট’ বদল।
প্রীতি > পিরতিপিরতি‘র’ ও ‘ত’ বদল।
স্নেহ > সেহ্নসেহ্ন‘ন’ ও ‘হ’ বদল।
ব্যাকরণ > ব্যাকরনব্যাকরন‘ণ’ ও ‘ন’ বদল।
ডিসেম্বর > ডেসিম্বরডেসিম্বর‘স’ ও ‘ম’ বদল।
ফেব্রুয়ারি > ফরুবারিফরুবারি‘ব’ ও ‘র’ বদল।
সেপ্টেম্বর > সেতম্বরসেতম্বর‘প’ ও ‘ত’ বদল।

মনে রাখার কৌশল:

“ধ্বনি বদলালো জায়গা, সেটাই বিপর্যয়।”
“রিক্সা > রিস্কা—ক-স উল্টে গেল।”

চ) ধ্বনি লোপ (Elision / Deletion)

সংজ্ঞা: উচ্চারণের সুবিধার জন্য শব্দের কোনো ধ্বনি সম্পূর্ণ বাদ পড়ে যাওয়াকে ধ্বনি লোপ বলে।

উদাহরণ (২০+):

মূল শব্দপরিবর্তিত রূপব্যাখ্যা
রাত্রিরাত‘র’-এর লোপ।
হস্তহাত‘স’-এর লোপ।
দুগ্ধদুধ‘গ’-এর লোপ।
ভক্তিভাতি‘ক’-এর লোপ।
মুক্তিমুতি‘ক’-এর লোপ।
পক্ষপাখ‘ক’-এর লোপ।
সূর্যসূরুজ‘য’-এর লোপ (আঞ্চলিক)।
চন্দ্রচাঁদ‘ন’-এর লোপ।
কর্মকম‘র’-এর লোপ।
পূর্ণপুরা‘ণ’-এর লোপ।
স্বামীসোয়ামি‘ব’-এর লোপ।
উৎসবউসব‘ত’-এর লোপ।
বৎসরবছর‘ত’-এর লোপ।
স্ত্রীত্রি‘স’-এর লোপ।
স্পষ্টপষ্ট‘স’-এর লোপ।
স্নানসান‘ন’-এর লোপ (আঞ্চলিক)।
গ্রামগাঁ‘র’-এর লোপ।
প্রাণপাঁন‘র’-এর লোপ।
শ্রাবণসাওন‘র’-এর লোপ।
কষ্টকট‘শ’-এর লোপ।

মনে রাখার কৌশল:

“ধ্বনি বাদ পড়লে লোপ।”
“রাত্রি > রাত—র উধাও।”

ছ) আগম (Insertion / Epenthesis)

সংজ্ঞা: উচ্চারণের সুবিধার জন্য শব্দের মধ্যে নতুন ধ্বনি যুক্ত হওয়াকে আগম বা শ্রুতিধ্বনি বলে। (আগের লেকচারে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে)

উদাহরণ (২০+):

মূল শব্দপরিবর্তিত রূপব্যাখ্যা
রত্নরতন‘অ’-এর আগম।
স্নানসিনান‘ই’-এর আগম।
গ্রামগেরাম‘এ’-এর আগম।
ক্লেশকিলেশ‘ই’-এর আগম।
স্কুলইস্কুল‘ই’-এর আগম।
স্টেশনইস্টিশন‘ই’-এর আগম।
স্মরণসিমরণ‘ই’-এর আগম।
স্ত্রীইস্ত্রি‘ই’-এর আগম।
ক্ষমাখমা‘অ’-এর আগম।
জ্ঞানগ্যাঁন‘অ্যা’-এর আগম।
প্রীতিপিরিতি‘ই’-এর আগম।
স্ফূর্তিফুর্তি‘অ’-এর আগম।
শ্লোকশিলোক‘ই’-এর আগম।
ভ্রমভিরম‘ই’-এর আগম।
ধ্রুবধিরুব‘ই’-এর আগম।
প্লাবনপিলাবন‘ই’-এর আগম।
হ্রদহিরদ‘ই’-এর আগম।
দ্রুতদিরুত‘ই’-এর আগম।
ব্রতবিরত‘ই’-এর আগম।
ক্রোধকিরোধ‘ই’-এর আগম।

মনে রাখার কৌশল:

“নতুন ধ্বনি ঢুকলে আগম।”
“রত্ন > রতন—অ ঢুকেছে।”


৩. ধ্বনি পরিবর্তনের প্রকারভেদে পার্থক্য (Summary Comparison)

প্রকারমূল বৈশিষ্ট্যউদাহরণ
অপিনিহিতিপরের স্বর আগে এলেসত্য > সইত্য
সমীভবনদুটি ধ্বনি মিলে একপদ্ম > পদ্দ
বিষমীভবনএকই ধ্বনি আলাদা হলেবর্ষা > বচ্ছা
স্বরসংগতিআগের স্বরের প্রভাবে পরে বদলায়দেশি > দিশি
ধ্বনি বিপর্যয়দুটি ধ্বনির স্থান বদলে যায়রিক্সা > রিস্কা
ধ্বনি লোপধ্বনি বাদ পড়েরাত্রি > রাত
আগমনতুন ধ্বনি যোগ হয়রত্ন > রতন

🧠 গ্রামাটিক্যাল ব্যাখ্যা ও মনে রাখার কৌশল (Rules & Tricks)

Trick 1: সব পরিবর্তন এক নজরে

“আগে এলে অপিনিহিতি, মিলে গেলে সমীভবন,
আলাদা হলে বিষমীভবন, স্বর টানলে স্বরসংগতি,
জায়গা বদলালে বিপর্যয়, বাদ পড়লে লোপ,
নতুন ঢুকলে আগম—এই সাতেই ধ্বনি পরিবর্তন।”

Trick 2: অপিনিহিতি বনাম স্বরসংগতি

  • অপিনিহিতি: পরের স্বর আগে আসে (সত্য > সইত্য)।
  • স্বরসংগতি: আগের স্বরের প্রভাবে পরে বদলায় (দেশি > দিশি)।
    শর্টকাট:

“অপিনিহিতিতে ই-উ এগিয়ে আসে, স্বরসংগতিতে আগের টানে পরে বদলায়।”

Trick 3: সমীভবন বনাম বিষমীভবন

  • সমীভবন: দুটি ভিন্ন ধ্বনি কাছাকাছি/একই হয় (পদ্ম > পদ্দ)।
  • বিষমীভবন: দুটি একই/কাছাকাছি ধ্বনি আলাদা হয় (বর্ষা > বচ্ছা)।
    শর্টকাট:

“সমীভবনে মিল, বিষমীভবনে বিচ্ছেদ।”

Trick 4: লোপ বনাম আগম

  • লোপ: ধ্বনি বাদ পড়ে (রাত্রি > রাত)।
  • আগম: ধ্বনি যোগ হয় (রত্ন > রতন)।
    শর্টকাট:

“লোপে বিয়োগ, আগমে যোগ।”

⚠️ ভুল যেখানে হয় (Common Mistakes)

  1. অপিনিহিতি ও স্বরসংগতি গুলিয়ে ফেলা: অপিনিহিতিতে পরের স্বর আগে আসে; স্বরসংগতিতে আগের স্বর পরের স্বরকে বদলে দেয়।
  2. সমীভবন ও বিষমীভবন গুলিয়ে ফেলা: সমীভবনে মিল, বিষমীভবনে অমিল।
  3. ‘সত্য > সইত্য’ কে সমীভবন ভাবা: এটি অপিনিহিতি।
  4. ‘পদ্ম > পদ্দ’ কে বিষমীভবন ভাবা: এটি সমীভবন।
  5. ‘রাত্রি > রাত’ কে আগম ভাবা: এটি ধ্বনি লোপ।
  6. ‘রত্ন > রতন’ কে লোপ ভাবা: এটি আগম।
  7. ধ্বনি বিপর্যয় চিনতে না পারা: দুটি ধ্বনি স্থান বদল করলে বিপর্যয় (রিক্সা > রিস্কা)।

✍️ অনুশীলনী (Exercise)

A) বিগত সালের প্রশ্ন (MCQ)

১। ‘সত্য > সইত্য’ কী ধরনের ধ্বনি পরিবর্তন? [BCS 44th]
ক) সমীভবন
খ) অপিনিহিতি
গ) বিষমীভবন
ঘ) স্বরসংগতি

২। ‘পদ্ম > পদ্দ’ কী ধরনের পরিবর্তন? [Primary 2023]
ক) অপিনিহিতি
খ) সমীভবন
গ) ধ্বনি লোপ
ঘ) আগম

৩। ‘বর্ষা > বচ্ছা’ কী ধরনের?
ক) সমীভবন
খ) বিষমীভবন
গ) স্বরসংগতি
ঘ) ধ্বনি বিপর্যয়

৪। ‘দেশি > দিশি’ কী ধরনের? [SSC 2022]
ক) অপিনিহিতি
খ) স্বরসংগতি
গ) সমীভবন
ঘ) ধ্বনি লোপ

৫। ‘রাত্রি > রাত’ কী ধরনের?
ক) আগম
খ) ধ্বনি লোপ
গ) সমীভবন
ঘ) বিষমীভবন

৬। ‘রত্ন > রতন’ কী ধরনের?
ক) ধ্বনি লোপ
খ) আগম
গ) অপিনিহিতি
ঘ) স্বরসংগতি

৭। ‘রিক্সা > রিস্কা’ কী ধরনের?
ক) ধ্বনি বিপর্যয়
খ) সমীভবন
গ) অপিনিহিতি
ঘ) বিষমীভবন

৮। ধ্বনি বিপর্যয় কাকে বলে? [NTRCA 2020]
ক) ধ্বনি বাদ পড়া
খ) ধ্বনি যোগ হওয়া
গ) ধ্বনির স্থান বদল
ঘ) ধ্বনি মিলে যাওয়া

৯। ‘চক্র > চক্ক’ কী ধরনের?
ক) প্রগত সমীভবন
খ) পরাগত সমীভবন
গ) বিষমীভবন
ঘ) অপিনিহিতি

১০। ‘গৃহ > গিরহ’ কী ধরনের?
ক) সমীভবন
খ) বিষমীভবন
গ) ধ্বনি বিপর্যয়
ঘ) স্বরসংগতি

১১। ‘লহু > লুহু’ কী ধরনের?
ক) অপিনিহিতি
খ) স্বরসংগতি
গ) সমীভবন
ঘ) ধ্বনি লোপ

১২। ‘লাল > নাল’ কী ধরনের?
ক) সমীভবন
খ) বিষমীভবন
গ) ধ্বনি বিপর্যয়
ঘ) আগম

১৩। ‘স্কুল > ইস্কুল’ কী ধরনের?
ক) ধ্বনি লোপ
খ) আগম
গ) অপিনিহিতি
ঘ) স্বরসংগতি

১৪। ‘বাক্য > বাইক্য’ কী ধরনের?
ক) অপিনিহিতি
খ) সমীভবন
গ) বিষমীভবন
ঘ) ধ্বনি বিপর্যয়

১৫। ‘কন্যা > কইন্যা’ কী ধরনের?
ক) স্বরসংগতি
খ) অপিনিহিতি
গ) সমীভবন
ঘ) ধ্বনি লোপ

B) সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর (Short Questions)

১। ধ্বনির পরিবর্তন কাকে বলে?
উত্তর: উচ্চারণের সুবিধার জন্য শব্দের মূল ধ্বনি সময়ের সাথে বদলে গিয়ে নতুন রূপ ধারণ করাকে ধ্বনির পরিবর্তন বলে। যেমন— সত্য > সইত্য, পদ্ম > পদ্দ।

২। অপিনিহিতি ও স্বরসংগতির মধ্যে পার্থক্য লেখো।
উত্তর: অপিনিহিতিতে পরের স্বরধ্বনি আগে চলে আসে (সত্য > সইত্য); স্বরসংগতিতে আগের স্বরের প্রভাবে পরের স্বর বদলায় (দেশি > দিশি)।

৩। সমীভবন ও বিষমীভবনের মধ্যে পার্থক্য লেখো।
উত্তর: সমীভবনে দুটি ভিন্ন ধ্বনি কাছাকাছি বা একই হয়ে যায় (পদ্ম > পদ্দ); বিষমীভবনে দুটি একই/কাছাকাছি ধ্বনি আলাদা হয়ে যায় (বর্ষা > বচ্ছা)।

৪। ধ্বনি লোপ ও আগমের মধ্যে পার্থক্য লেখো।
উত্তর: ধ্বনি লোপে শব্দের কোনো ধ্বনি বাদ পড়ে (রাত্রি > রাত); আগমে শব্দে নতুন ধ্বনি যোগ হয় (রত্ন > রতন)।

৫। ধ্বনি বিপর্যয় কাকে বলে? উদাহরণ দাও।
উত্তর: শব্দের দুটি ধ্বনির স্থান বদলে যাওয়াকে ধ্বনি বিপর্যয় বলে। যেমন— রিক্সা > রিস্কা, রৌদ্র > রোদ্দুর।

৬। ধ্বনি পরিবর্তন কত প্রকার ও কী কী?
উত্তর: ধ্বনি পরিবর্তন প্রধানত ৭ প্রকার—অপিনিহিতি, সমীভবন, বিষমীভবন, স্বরসংগতি, ধ্বনি বিপর্যয়, ধ্বনি লোপ, আগম।

৭। ‘সত্য > সইত্য’ এবং ‘পদ্ম > পদ্দ’—এদের পার্থক্য কী?
উত্তর: ‘সত্য > সইত্য’ অপিনিহিতি (পরের স্বর আগে এসেছে); ‘পদ্ম > পদ্দ’ সমীভবন (দুটি ধ্বনি মিলে এক)।

C) উত্তরমালা (Answer Key with Explanation)

১. খ) অপিনিহিতি
ব্যাখ্যা: পরের স্বর ‘ই’ আগে এসেছে।

২. খ) সমীভবন
ব্যাখ্যা: ‘ম’ > ‘দ’, দুটি ধ্বনি মিলে এক।

৩. খ) বিষমীভবন
ব্যাখ্যা: ‘র-ষ’ আলাদা হয়ে ‘চ-ছ’।

৪. খ) স্বরসংগতি
ব্যাখ্যা: আগের ‘এ’-র প্রভাবে পরে ‘ই’।

৫. খ) ধ্বনি লোপ
ব্যাখ্যা: ‘র’-এর লোপ।

৬. খ) আগম
ব্যাখ্যা: ‘অ’ নতুন যুক্ত হয়েছে।

৭. ক) ধ্বনি বিপর্যয়
ব্যাখ্যা: ‘ক-স’ স্থান বদল করেছে।

৮. গ) ধ্বনির স্থান বদল
ব্যাখ্যা: ধ্বনি বিপর্যয়ে স্থান পরিবর্তন হয়।

৯. খ) পরাগত সমীভবন
ব্যাখ্যা: পরের ‘র’-এর প্রভাবে আগের ‘ক’ > ‘ক’।

১০. খ) বিষমীভবন
ব্যাখ্যা: ‘ঋ’ ভেঙে ‘র’ + ‘ই’ আলাদা।

১১. ক) অপিনিহিতি
ব্যাখ্যা: পরের ‘উ’ আগে এসেছে।

১২. খ) বিষমীভবন
ব্যাখ্যা: ‘ল’ > ‘ন’, একই ধ্বনি আলাদা।

১৩. খ) আগম
ব্যাখ্যা: ‘ই’ নতুন যুক্ত হয়েছে।

১৪. ক) অপিনিহিতি
ব্যাখ্যা: ‘ই’ আগে চলে এসেছে।

১৫. খ) অপিনিহিতি
ব্যাখ্যা: ‘ই’ আগে চলে এসেছে।


❓ প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)

প্রশ্ন ১: ধ্বনির পরিবর্তন কত প্রকার?
উত্তর: ধ্বনির পরিবর্তন প্রধানত ৭ প্রকার—অপিনিহিতি, সমীভবন, বিষমীভবন, স্বরসংগতি, ধ্বনি বিপর্যয়, ধ্বনি লোপ, আগম।

প্রশ্ন ২: অপিনিহিতি ও স্বরসংগতির মধ্যে পার্থক্য কীভাবে মনে রাখব?
উত্তর: “অপিনিহিতিতে পরের স্বর আগে আসে (সত্য > সইত্য); স্বরসংগতিতে আগের স্বর পরে বদলায় (দেশি > দিশি)।”

প্রশ্ন ৩: সমীভবন ও বিষমীভবনের পার্থক্য কী?
উত্তর: সমীভবনে দুটি ধ্বনি মিলে যায় (পদ্ম > পদ্দ); বিষমীভবনে দুটি ধ্বনি আলাদা হয় (বর্ষা > বচ্ছা)।

প্রশ্ন ৪: ‘সত্য > সইত্য’ কেন অপিনিহিতি?
উত্তর: কারণ এখানে পরের স্বরধ্বনি ‘ই’ আগে চলে এসেছে এবং ‘য’-এর স্থান দখল করেছে। এটিই অপিনিহিতির প্রধান বৈশিষ্ট্য।

প্রশ্ন ৫: ‘রত্ন > রতন’ কেন আগম?
উত্তর: কারণ মূল শব্দ ‘রত্ন’-তে ‘অ’ ছিল না; উচ্চারণের সুবিধার জন্য নতুন ‘অ’ ধ্বনি যুক্ত হয়ে ‘রতন’ হয়েছে। এটিই আগম।


🏁 উপসংহার (Conclusion)

প্রিয় পরীক্ষার্থী, আজ আমরা ধ্বনির পরিবর্তন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করলাম। মনে রাখার মূল ছড়া:

“আগে এলে অপিনিহিতি, মিলে গেলে সমীভবন,
আলাদা হলে বিষমীভবন, স্বর টানলে স্বরসংগতি,
জায়গা বদলালে বিপর্যয়, বাদ পড়লে লোপ,
নতুন ঢুকলে আগম—এই সাতেই ধ্বনি পরিবর্তন।”

এই ট্রিকসগুলো অনুশীলন করলে পরীক্ষায় ধ্বনি পরিবর্তন থেকে আসা সব প্রশ্নে আপনি পূর্ণ নম্বর পাবেন। ভাষার বিবর্তন বোঝা মানেই ব্যাকরণে দক্ষতা। সফলতা আপনার হবেই।

লেখক: ToLearnTeam.com শিক্ষা বিভাগ
সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply